৩০ শে মে, ২০১২ সকাল ৯:৫৩
সৈ য় দ আ ব দা ল আ হ ম দ
মৃত্যুর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়া একদিন আমাকে বলেন, আমি তো অবসরে যাবো। অবসরে যাওয়ার পর আমি কীভাবে বেঁচে থাকবো, তার পরিকল্পনা করেছি। নোট লিখে রাখছি। আমি আমার আত্মজীবনী লিখবো। আমার মনে হয় লোকে আমার বই কিনবে। আর ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ সম্পর্কেও আরেকটি বই লিখবো। এছাড়া আমার একটা সাইকেল আছে। সাভারে আমার সাড়ে সাত কাঠা জমি আছে। পেনশন থেকে যে টাকা পাবো, সেই টাকা দিয়ে একটা বাড়ি করবো। দেখেন কী ধরনের সত্ চিন্তা। দেশের প্রেসিডেন্ট! একটা গাড়ি কেনার কথাও বলেননি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এ কথাগুলো লিখে গেছেন তাঁরই রাজনৈতিক সহকর্মী এম সাইফুর রহমান। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়া ও খালেদা জিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এ সময়ে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সংসদে বারো বার বাজেট পেশ করার বিরল সম্মান লাভ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ২০০৯ সালে ‘কিছু কথা কিছু স্মৃতি’ নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ে তিনি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে অজানা অনেক কথা লিখে গেছেন।
সাইফুর রহমান লিখেছেন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিশু একাডেমি, মেয়েদের শিক্ষা, যুব মন্ত্রণালয়, কালচারাল ইনস্টিটিউট, মহিলা মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমী, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং আরো অনেক কাজ জিয়া করেন। এসব ছিল তাঁর ভিশনারী কতগুলো প্রোগ্রাম। ঐব ধিং ধ সধহ ড়ভ ারংরড়হ. তার নধপশমত্ড়ঁহফ ছিল মিলিটারি। তবুও আমার কাছে মনে হয়, ঐব পধসব রিঃয ধ ফবংঃরহু ঃড় পত্বধঃব ধ পড়ঁহঃত্ু, ধ ফবংঃরহু ভড়ত্ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয.
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, সৈনিক জিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয় ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে। সম্ভবত মাসটি ছিল ফেব্রুয়ারি, এক ডিনার পার্টিতে। একেএম মুসার ধানমন্ডির বাড়িতে। স্বাভাবিকভাবে আমি তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার জন্য উত্সুক ছিলাম। কারণ তাঁর কণ্ঠেই আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলাম চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে। তিনি ছিলেন বেশ চুপচাপ; কথা বলছিলেন কম, শুনছিলেন বেশি। ওই সন্ধ্যায় তাঁর সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন ছিল এই লোকটির মধ্যে নেতৃত্বের গুণ আছে এবং তিনি জীবনে উপরে উঠবেন। তিনি ছিলেন স্থিরমস্তিষ্ক, অমায়িক, মৃদুভাষী। তাঁর মধ্যে গর্ব বা ঔদ্ধত্যের লেশমাত্র দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে সদ্য ফিরে আসা বীরের মধ্যে তা থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। যা হোক, আমাদের এ সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো। অবস্থা এমন হলো যে, ওই ঘটনার এক মাস বা তার কিছুদিন পরে আমাকে জাতীয় পে-কমিশনের সদস্য করা হয়। ওই কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় সচিব মরহুম এমএ রব। বৈঠকে দেখলাম আমার ডান পাশে বসে আছেন জিয়া। এটা আমার জন্য ছিল এক মধুর বিস্ময়। তিনি প্রতিনিধিত্ব করছিলেন প্রতিরক্ষা সার্ভিসের। তিনি ছিলেন কমিশনেরও একজন সদস্য।
এরপর একে অপরের বাসায় এবং অন্যান্য স্থানে আমরা অনেকবার মিশেছি। আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ডিনার অথবা কোনো সভায়। আমার স্ত্রী ও জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে যোগাযোগ হয় এবং তারা ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত হন। তারা দু’জন একে অপরের সঙ্গে ইচ্ছা হলে আমাদের ছাড়াই দেখা-সাক্ষাত্ করতেন যখন-তখন। জিয়ার সঙ্গে আমার কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হয় বাংলাদেশের এই প্রথম পে-কমিশনের সদস্য হিসেবে। কমিশনটি গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার পর। ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর ৭ নভেম্বর ঘটে সিপাহী-জনতার বিপ্লব। সিপাহী-জনতা জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনে। প্রকৃতপক্ষে এ সময়ই জেনারেল জিয়া ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তখন দেশে চলছিল এক অস্থির অবস্থা। চলছিল রাজনৈতিক শূন্যতা। এই অবস্থা থেকে দেশকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেসব বিষয়ে জেনারেল জিয়া চিন্তা করতে থাকেন। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসন তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ওই অনিশ্চিত ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন। কারণ সিপাহী-জনতার বিপ্লব কোনো সহজ বিষয় নয়। সিপাহীরা বিশৃঙ্খল হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে ব্যারাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া খুব সহজ কাজ ছিল না। জিয়াউর রহমানের জন্য এটা ছিল একটা ‘হারকিউলিয়ান টাস্ক’ এবং তিনি ওই কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি পরিস্থিতিকে শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। আলোচনা, অনুরোধ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে ওই সঙ্কট উত্তরণে তিনি সমর্থ হন। এ সময় প্রেসিডেন্ট বিচারপতি এএসএম সায়েম ছিলেন প্রেসিডেন্ট। বেশ কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকে তার উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। এর মধ্যে আমিও ছিলাম। আর ছিলেন ড. এমএন হুদা, জনাব হাফিজ উদ্দিন, সৈয়দ আলী আহসান, ড. এমএ রশীদ, ড. ফসীহউদ্দিন মাহতাব, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং আরো কয়েকজন। এ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের লোকে বলতো অ মধষধীু ড়ভ ঃধষবহঃং.
জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে কেন এবং কীভাবে যোগ দিলেন, সেই স্মৃতি সম্পর্কে সাইফুর রহমান লেখেন, জিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম উপদেষ্টা করলেন আকবর কবীরকে। তাকে দেয়া হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। জিয়া তাঁর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময় আমাকে মাঝে মাঝে চা খেতে ডাকতেন। কিছুদিন জিয়া অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। ফলে বিভিন্ন বিষয় বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন। কোন লোকদের দিয়ে কী ধরনের কাজ করানো যায়, সে পরামর্শও নিতেন। কারণ তিনি আমাকে পে-কমিশনের সদস্য হিসেবে জানতেন। আমার ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কেও তাঁর জানা ছিল। আমি আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তাঁকে সত্ পরামর্শ দিয়েছিলাম। একদিন তিনি বললেন, বাইরে থেকে এসব পরামর্শ দিয়ে কোনো লাভ হয় না, এতে সঠিকভাবে কাজ হয় না। আপনি উপদেষ্টা কাউন্সিলে যোগ দিন। একটা কথা তিনি প্রায়ই বলতেন, আমি সামরিক বাহিনীতে ছিলাম। সিভিলিয়ান লোকদের আমি বেশি চিনি না। আপনি আসলে আপনার মাধ্যমে বেসামরিক লোকদের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারবো। জেনারেল জিয়া আমাকে এ প্রস্তাব দেন ১৯৭৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে। আমি তাঁকে বলি যে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি নিজের পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তাছাড়া মিলিটারি প্রশাসন সম্পর্কে আমার গভীর অনীহা আছে। তিনি বলেন, এখন তো আর মিলিটারি ব্যবস্থা নয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক কিছুর উত্থান-পতন ঘটে গেছে। এখন অনেকটা শান্ত, পুনর্গঠনের কাজ চলছে। তাছাড়া আমিও বিশ্বাস করি সামরিক শাসন বেশিদিন চলতে পারে না। এটা সমস্যার সমাধান নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রে দ্রুত দেশকে নিয়ে যেতে হবে। আপনাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে দেশের জন্য কল্যাণ হবে। এর কয়েক দিন পর জেনারেল জিয়ার একান্ত সচিব (মিলিটারি) আমাকে টেলিফোন করেন। বলেন, জেনারেল জিয়ার সঙ্গে চায়ের আমন্ত্রণ। ওই দিন তিনি আমাকে বলেন, আপনাকে অনেক দিন থেকে বলছি আপনি আসছেন না। আপনার আর দেরি করা ঠিক নয়। উপদেষ্টা পরিষদে অনেকেই আছেন। তারা কাজ করছেন। তাদের ধ্যান-ধারণা অনেকটা পুরনো। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে নতুন ধ্যান-ধারণায়।
আমি তাকে জানাই যে, দেশের বাইরে লন্ডনে যাচ্ছি। ফিরে আসার পর আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবো। লন্ডন থেকে ফিরে এলে তিনি আবার ফোন করেন। বললেন, আপনাকে আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে চাই। আমি বললাম আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মত আছি, তবে বেশি দিন এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। জিয়া বললেন, বেশি দিন থাকতে হবে না। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই নির্বাচন দেয়া হবে। তবে আমার স্ত্রী আমার সিদ্ধান্তে রাজি ছিলেন না। আমার শ্বশুর চট্টগ্রামে ছিলেন। তাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। তার পরামর্শ চাই। তিনি বললেন, দেখ বাবা, রাজনীতি করতে আমি তোমাকে বলি না, দেশটা স্বাধীন হয়েছে, এইজন্য অনেক লোক কষ্ট করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। এই অবস্থায় উপদেষ্টা পরিষদে যাওয়া বিবেচনার বিষয়। এর সঙ্গে কিছুটা ঝুঁকি অবশ্যই আছে। তবে ঝুঁকি এড়িয়ে জীবনে বড় হওয়া যায় না। আর এ সময় জাতি নেতৃত্বহীনভাবে ভাসমান অবস্থায় আছে। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের মাঝে জাহাজের একজন নাবিক কতটুকুই-বা কাজ করতে পারেন। তোমাদের মতো কিছু লোক যদি তাকে সাহায্য করে, তাহলে দেশের উপকার হবে। জিয়াউর রহমানও বলতেন, আপনারা কাজ করছেন দেশের জন্য, আমার জন্য নয়। এ সময় আপনাদের দেশের জন্য কাজ করতে হবে। এটা শুধু আমার একার দায়িত্ব নয়, আপনাদেরও দায়িত্ব। ফলে ওই উপদেষ্টা পরিষদে আমি যোগদানের সিদ্ধান্ত নিই। প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটা বিষয় আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি সত্ মানুষকে গুরুত্ব দিতেন এবং উপদেষ্টা পরিষদেও সেধরনের লোকের সমাবেশ ঘটান।
জিয়ার গণভোট সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে এম সাইফুর রহমান লেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া একদিন বললেন, উপদেষ্টা পরিষদ দিয়ে কতোদিন দেশ চালানো যায়? রাজনৈতিক শূন্যতা দেশের জন্য ভালো নয়। তাছাড়া সেনাবাহিনীর চিফ ও প্রেসিডেন্ট এক ব্যক্তি—এ নিয়ে কথা উঠছিল। জিয়ার ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের মত আছে কিনা, তা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। তখন উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত (এরপর ১০-এর পৃষ্ঠায়)
নেয়া হয় প্রেসিডেন্টের উচিত গণভোটে যাওয়া। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াকে চায় কিনা। সেকারণে ‘হ্যাঁ না’ ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। জিয়া প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক আইন প্রশাসক ও বেসরকারি উপদেসষ্টা পরিষদের সমন্বয় সাধন করা প্রেসিডেন্টের পক্ষে কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়। যাই হোক, ১৯৭৭ সালের ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
এই রেফারেন্ডাম বা গণভোটের জন্য প্রচারকাজে বিভিন্ন এলাকায় জনসভা করার প্রয়োজন ছিল। ড. এমএন হুদা বললেন, তিনি যেতে পারবেন না। হাফিজ উদ্দিন এবং আরো কয়েকজন উপদেষ্টা বললেন, গণভোটের প্রচার অভিযান তারা করতে পারবেন না। এ সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে গণভোটের ক্যাম্পেইন করার কাজ করতে বলেন। গণভোটের পক্ষে পাবলিসিটি—এটাই ছিল আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এর আগে আমি কখনো জনসভা বা পাবলিক মিটিংয়ে যাইনি। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কাজে বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের সময় কাজ করেছিলাম। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ জিয়াউর রহমানের গণভোটের মাধ্যমে। আমি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রচার চালাই। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, দেশে দ্রুত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করলেন। অরাজনৈতিক উপদেষ্টাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক লোকদেরও উপদেষ্টা করলেন, জাগদল গঠিত হলো। দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলো। এরপর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করে সব দলের উপস্থিতিতে সংসদ নির্বাচন হলো। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করলেন জিয়া। প্রফেসর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তিত্ব যোগ দিলেন। প্রতিটি প্রক্রিয়ার সঙ্গেই ছিলাম আমি। জিয়াউর রহমান আমাকে বিশ্বাস করতেন এবং আমার প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আস্থা। আমিও তাঁকে সবসময় সত্পরামর্শ দিয়েছি এবং সবধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।
সাইফুর রহমান লেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটা গুণ ছিল, তিনি যদি কাউকে কোনো কাজে পাঠাতেন বা তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে যারা যেতেন তারা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করতেন, তাহলে তিনি তার প্রশংসা করতেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়ার জন্য নির্ধারিত অস্থায়ী সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নতুন দেশ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করানো। সে সময় জাপান আমাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়। জাপানের মতো একটা শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো কিনা, তা নিয়ে প্রথমেই আমাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তাছাড়া আমাদের বড় ডোনার কান্ট্রিও ছিল জাপান। উপদেষ্টা কাউন্সিলে এ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় সবাই বললেন, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। একটিমাত্র অস্থায়ী সদস্যপদ। প্রতি দু’বছর পর পর জাপান প্রার্থী দেয়, এটা ফেয়ার নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, ভারত আমাদের সমর্থন করলে আমরা জয়ী হতে পারবো। তিনি বললেন ইন্ডিয়ার সঙ্গে সাইফুর রহমানের সম্পর্ক ভালো। উনি ইন্ডিয়াকে বোঝাতে পারবেন। ফলে আমি প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হয়ে ভারতে গেলাম। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হলো। তিনি তার পররাষ্ট্র সচিবের আপত্তি সত্ত্বেও তত্ক্ষণাত্ বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানান। একইসঙ্গে আমাকে পাঠানো হলো শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে। তিনটি দেশ সফর করে তাদের সমর্থন আদায় করলাম। তারা আমাদের সমর্থন জানায় এবং বাংলাদেশ ওই সম্মানিত পদে নির্বাচিত হয়। এজন্য প্রেসিডেন্ট জিয়া খুব খুশি হন। ওই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুহাম্মদ শামস উল হক। তিনি আমাকে একটা পত্র দেন। ওই পত্রে তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন যে, আপনার কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে জাপান সফরের এক স্মৃতির কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, অধ্যাপক শামস উল হক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে প্রকৃতপক্ষে আমিই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ করতাম। আমাকে বার বার ইন্ডিয়া যেতে হয়েছে, প্রেসিডেন্ট আমাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গেছেন। ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিশনেও আমাকে যেতে হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ওহিরা’র মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আমাকেই ফিউনারেলে পাঠানো হবে। এতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দেবেন। আমরা প্রতিনিধি দলে ছিলাম ৩ জন। আমি, পররাষ্ট্র সচিব এসএমএসএ কিবরিয়া ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি এমআর ওসমানী। সময়টা ছিল ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের বাইরে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ সামনেই সাধারণ নির্বাচন ছিল। জাপান যাওয়ার একদিন আগে জিয়া আমাকে টেলিফোন করলেন রাত ৮টার দিকে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও খুব কাছাকাছি ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া মনে করেছিলেন, নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রেসিডেন্ট কার্টার আসতে পারবেন না। কিন্তু পরেই জানা গেল প্রেসিডেন্ট কার্টার একদিনের জন্য জাপান যাবেন এবং ফিউনারেলে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের স্বার্থেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাত্ করা জরুরি। তাছাড়া এর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট কার্টারের সাক্ষাত্ হয়নি। ফিউনারেলে যোগদানে এই সুযোগটি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু প্রতিনিধি দলের নাম আগেই চলে গেছে। এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে টেলিফোন করে বলেন, ‘মিস্টার ফাইন্যান্স মিনিস্টার, উড ইউ টেক মি এজ ইউর কমপেনিয়ন ইন জাপান।’ উনি আরো বললেন, আপনারা ফাইন্যান্স মিনিস্টাররা অত্যন্ত লাকি। দু’দিন পর পর বিদেশ চলে যান। ওয়াশিংটন, জেনেভা, লন্ডন, টোকিও। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার সুযোগ তো কম। কোনো প্রেসিডেন্ট দাওয়াত না করলে এবং প্রকৃত উপযোগী সফর না হলে তো যাওয়া যায় না। আমি তখন রসিকতা করে বলি, ফাইন্যান্স মিনিস্টার হওয়ার জন্য আপনি যু্দ্ধ করেছেন? তাহলে প্রেসিডেন্সি চলবে কী করে? যা হোক, আপনি কি যেতে চান? উনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তো যেতে চাই। প্রতিনিধি দলের নাম তো তাদের কাছে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আই উড লাইক টু মাই সেলফ এজ এ মেম্বার অব দ্য ডেলিগেশন। আমি বললাম, ডেলিগেশনে আপনার নাম শুধু যোগ হবে না, ইউ উইল বি লিডিং দ্য ডেলিগেশন। এভাবেই তিনি জাপান গেলেন। তিনি আমার সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন। আমরা ওনার সঙ্গী হলাম। দেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া কত সুন্দরভাবে কথাগুলো বলেন। কারণ তিনি জানতেন দলের নাম আগেই জাপান পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রটোকলের বিষয় ছিল। এসব কারণে তিনি ওইভাবে কথা বলেননি। যা হোক, আমরা জাপান গেলাম। প্রেসিডেন্ট কার্টারের সঙ্গে জিয়ার সাক্ষাত্ হলো। আমি জাপানের কাছ থেকে ৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণেরও ব্যবস্থা করলাম। আমার কথা শুনে প্রেসিডেন্ট জিয়া চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে ওআইসিতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ওআইসির মতো একটা আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখা ভালো।
চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, ১৯৮১ সালের বাজেট প্রস্তুতির কাজ করছিলাম। ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জিয়া ভোর বেলা আমাকে টেলিফোন করে বলেন, আমি চট্টগ্রাম যাচ্ছি। আপনার কাছে দু’টো ফাইল যাচ্ছে। তাতে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে। ফাইল দু’টো সই করে দেবেন। আমি প্রেসিডেন্টকে বললাম, বাজেট পেশ করার মাত্র ৬ দিন বাকি। এ সময় তো আপনার আমার সঙ্গে থাকার কথা। উনি বললেন আমি কালই চলে আসবো। এরপর আপনাকে সময় দেবো। তখন ব্যাংকে অরাজকতা চলছিল। আমি বললাম, এ ব্যাপারে আপনি যদি চট্টগ্রামের জনসভায় একটা কঠোর সতর্কবাণী দেন তাহলে ভালো হবে। এতে তারা সংযত হবে। প্রেসিডেন্ট জিয়া মন্তব্য করেন, আমাকেই সবকিছু করতে হবে কেন? তাহলে আপনারা আছেন কেন? কেন, সাত্তার সাহেব করতে পারেন না? উনি ভাইস প্রেসিডেন্ট না? প্রেসিডেন্ট জিয়া একনাগাড়ে কথাগুলো বললেন। তিনি সাধারণত এভাবে বলেন না। এটাই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।
৩০ মে ভোর বেলায় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। রাতেই প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয় আমি জানি না। আমি বাসায় ছিলাম। কারণ কথা ছিল প্রেসিডেন্ট ঢাকায় ফিরলে আমি বঙ্গভবনে যাবো এবং বাজেট নিয়ে আলোচনা করবো। ভোর বেলা বঙ্গভবন থেকে একটা টেলিফোন পাই, আমাকে সেখানে জরুরিভাবে যেতে বলা হলো। ফোন করেছেন সামরিক সচিব। আমি ভেবেছি হয়ত প্রেসিডেন্ট এসে গেছেন, আমাকে ডেকেছেন। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হয়েছেন। বঙ্গভবনে গিয়ে প্রেসিডেন্টের কামরায় ঢুকলাম। দেখলাম প্রেসিডেন্টের চেয়ারে জাস্টিস সাত্তার সাহেব বসে আছেন। এ অবস্থা দেখে আই গট এ শক। জামাল উদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার? জামাল উদ্দিন আমাকে বলেন, জানেন না? প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। আমি চমকে গেলাম। জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন বলে বঙ্গভবনে ধারণা পেলাম। জামালউদ্দিন বললো, এমনভাবে প্রেসিডেন্টের দিকে গুলি ছোঁড়া হয় যে, তাঁর দেহের অনেক অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাঁর লাশ চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। মঞ্জুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি এরকম একটি কাজ করবেন বলে আমার মনে হয় না। বেঁচে থাকার সময় দেখেছি জিয়ার সামনেই মঞ্জুর উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। তবু মঞ্জুর ছিলেন জিয়ার ভালো বন্ধু। জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। জিয়া সাহেবের পত্রের জবাব তিনি দিতেন উদ্ধতভাবে। আমরা এসব জানার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলি, আপনি চট্টগ্রামে যাবেন না। মঞ্জুর যদি কোন অঘটন ঘটায়। উনি হাসতেন। বলতেন, মঞ্জুর বুদ্ধিমান। বোকার মতো সে চট্টগ্রাম থেকে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে না। বস্তুত মঞ্জুর ছিলেন জিয়ার ভাল বন্ধু। প্রেসিডেন্ট জিয়ারও দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, মঞ্জুর তার কোনো ক্ষতি করবেন না। জিয়া নিহত হওয়ার পরদিন আমি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। তিনি খুবই শোকাহত ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, এতবড় একটি ঘটনা ঘটে গেল, একজন প্রেসিডেন্টকে মেরে ফেলা হলো, আর সবাই যে যার যার মতো সেখান থেকে পালিয়ে গেল, সৈন্যরাও কারো কোনো ক্ষতি করলো না, শুধু একজনকে পৃথকভাবে মারলো—এটা কী করে সম্ভব? উনি বার বার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ডাক্তার সাহেব কোথায় (অর্থাত্ অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী)? তখন বি চৌধুরীও জিয়ার সঙ্গে চট্টগ্রামে ছিলেন। আমি বললাম, ওনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। বেগম জিয়া তার মুখ থেকে হয়তো ওই সময়ের অবস্থা জানতে চাচ্ছিলেন। বেগম জিয়াও বিশ্বাস করতেন না যে, মঞ্জুর তার স্বামীকে হত্যা করেছে। কারণ জিয়া ও মঞ্জুর এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, একথা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, জিয়ার কোনো ক্ষতি করবে মঞ্জুর বা মেরে ফেলবে। মঞ্জুর জিয়াকে মেরেছে, একথা এখনো বেগম জিয়া বিশ্বাস করেন বলে আমার মনে হয় না। এটা এখনো অমীমাংসিত রহস্য রয়ে গেছে যে, জিয়াকে কে বা কারা মেরেছে। জেনারেল এরশাদ তাড়াহুড়া করে তদন্ত শেষে কয়েকজন লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিল।
জিয়ার মৃত্যুর পর আমি সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। বর্তমান সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ ইবনে আজিজ তখন ছিলেন ন্যাশনাল গার্ড-এর প্রধান। তিনি আমাকে চিনতেন। সৌদি সরকারের সবাই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সম্মান করতেন। তিনি আমাকে বললেন—তোমাদের লোকেরা কীভাবে জিয়াকে নিহত করতে পারলো? তিনি এমন একজন উদীয়মান তারকা যিনি মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিলেন। আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না।
মৃত্যুর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়া একদিন আমাকে বলেন, আমি তো অবসরে যাবো। অবসরে যাওয়ার পর আমি কীভাবে বেঁচে থাকবো, তার পরিকল্পনা করেছি। নোট লিখে রাখছি। আমি আমার আত্মজীবনী লিখবো। আমার মনে হয় লোকে আমার বই কিনবে। আর ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ সম্পর্কেও আরেকটি বই লিখবো। এছাড়া আমার একটা সাইকেল আছে। সাভারে আমার সাড়ে সাত কাঠা জমি আছে। পেনশন থেকে যে টাকা পাবো, সেই টাকা দিয়ে একটা বাড়ি করবো। দেখেন কী ধরনের সত্ চিন্তা। দেশের প্রেসিডেন্ট! একটা গাড়ি কেনার কথাও বলেননি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এ কথাগুলো লিখে গেছেন তাঁরই রাজনৈতিক সহকর্মী এম সাইফুর রহমান। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়া ও খালেদা জিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এ সময়ে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সংসদে বারো বার বাজেট পেশ করার বিরল সম্মান লাভ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ২০০৯ সালে ‘কিছু কথা কিছু স্মৃতি’ নামে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ে তিনি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে অজানা অনেক কথা লিখে গেছেন।
সাইফুর রহমান লিখেছেন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিশু একাডেমি, মেয়েদের শিক্ষা, যুব মন্ত্রণালয়, কালচারাল ইনস্টিটিউট, মহিলা মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমী, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং আরো অনেক কাজ জিয়া করেন। এসব ছিল তাঁর ভিশনারী কতগুলো প্রোগ্রাম। ঐব ধিং ধ সধহ ড়ভ ারংরড়হ. তার নধপশমত্ড়ঁহফ ছিল মিলিটারি। তবুও আমার কাছে মনে হয়, ঐব পধসব রিঃয ধ ফবংঃরহু ঃড় পত্বধঃব ধ পড়ঁহঃত্ু, ধ ফবংঃরহু ভড়ত্ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয.
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, সৈনিক জিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয় ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে। সম্ভবত মাসটি ছিল ফেব্রুয়ারি, এক ডিনার পার্টিতে। একেএম মুসার ধানমন্ডির বাড়িতে। স্বাভাবিকভাবে আমি তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার জন্য উত্সুক ছিলাম। কারণ তাঁর কণ্ঠেই আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলাম চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে। তিনি ছিলেন বেশ চুপচাপ; কথা বলছিলেন কম, শুনছিলেন বেশি। ওই সন্ধ্যায় তাঁর সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন ছিল এই লোকটির মধ্যে নেতৃত্বের গুণ আছে এবং তিনি জীবনে উপরে উঠবেন। তিনি ছিলেন স্থিরমস্তিষ্ক, অমায়িক, মৃদুভাষী। তাঁর মধ্যে গর্ব বা ঔদ্ধত্যের লেশমাত্র দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে সদ্য ফিরে আসা বীরের মধ্যে তা থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। যা হোক, আমাদের এ সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো। অবস্থা এমন হলো যে, ওই ঘটনার এক মাস বা তার কিছুদিন পরে আমাকে জাতীয় পে-কমিশনের সদস্য করা হয়। ওই কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় সচিব মরহুম এমএ রব। বৈঠকে দেখলাম আমার ডান পাশে বসে আছেন জিয়া। এটা আমার জন্য ছিল এক মধুর বিস্ময়। তিনি প্রতিনিধিত্ব করছিলেন প্রতিরক্ষা সার্ভিসের। তিনি ছিলেন কমিশনেরও একজন সদস্য।
এরপর একে অপরের বাসায় এবং অন্যান্য স্থানে আমরা অনেকবার মিশেছি। আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ডিনার অথবা কোনো সভায়। আমার স্ত্রী ও জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে যোগাযোগ হয় এবং তারা ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত হন। তারা দু’জন একে অপরের সঙ্গে ইচ্ছা হলে আমাদের ছাড়াই দেখা-সাক্ষাত্ করতেন যখন-তখন। জিয়ার সঙ্গে আমার কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হয় বাংলাদেশের এই প্রথম পে-কমিশনের সদস্য হিসেবে। কমিশনটি গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতার পর। ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর ৭ নভেম্বর ঘটে সিপাহী-জনতার বিপ্লব। সিপাহী-জনতা জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনে। প্রকৃতপক্ষে এ সময়ই জেনারেল জিয়া ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তখন দেশে চলছিল এক অস্থির অবস্থা। চলছিল রাজনৈতিক শূন্যতা। এই অবস্থা থেকে দেশকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেসব বিষয়ে জেনারেল জিয়া চিন্তা করতে থাকেন। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসন তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ওই অনিশ্চিত ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন। কারণ সিপাহী-জনতার বিপ্লব কোনো সহজ বিষয় নয়। সিপাহীরা বিশৃঙ্খল হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে ব্যারাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া খুব সহজ কাজ ছিল না। জিয়াউর রহমানের জন্য এটা ছিল একটা ‘হারকিউলিয়ান টাস্ক’ এবং তিনি ওই কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি পরিস্থিতিকে শান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। আলোচনা, অনুরোধ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে ওই সঙ্কট উত্তরণে তিনি সমর্থ হন। এ সময় প্রেসিডেন্ট বিচারপতি এএসএম সায়েম ছিলেন প্রেসিডেন্ট। বেশ কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকে তার উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। এর মধ্যে আমিও ছিলাম। আর ছিলেন ড. এমএন হুদা, জনাব হাফিজ উদ্দিন, সৈয়দ আলী আহসান, ড. এমএ রশীদ, ড. ফসীহউদ্দিন মাহতাব, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং আরো কয়েকজন। এ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের লোকে বলতো অ মধষধীু ড়ভ ঃধষবহঃং.
জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে কেন এবং কীভাবে যোগ দিলেন, সেই স্মৃতি সম্পর্কে সাইফুর রহমান লেখেন, জিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম উপদেষ্টা করলেন আকবর কবীরকে। তাকে দেয়া হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। জিয়া তাঁর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময় আমাকে মাঝে মাঝে চা খেতে ডাকতেন। কিছুদিন জিয়া অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। ফলে বিভিন্ন বিষয় বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন। কোন লোকদের দিয়ে কী ধরনের কাজ করানো যায়, সে পরামর্শও নিতেন। কারণ তিনি আমাকে পে-কমিশনের সদস্য হিসেবে জানতেন। আমার ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কেও তাঁর জানা ছিল। আমি আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তাঁকে সত্ পরামর্শ দিয়েছিলাম। একদিন তিনি বললেন, বাইরে থেকে এসব পরামর্শ দিয়ে কোনো লাভ হয় না, এতে সঠিকভাবে কাজ হয় না। আপনি উপদেষ্টা কাউন্সিলে যোগ দিন। একটা কথা তিনি প্রায়ই বলতেন, আমি সামরিক বাহিনীতে ছিলাম। সিভিলিয়ান লোকদের আমি বেশি চিনি না। আপনি আসলে আপনার মাধ্যমে বেসামরিক লোকদের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারবো। জেনারেল জিয়া আমাকে এ প্রস্তাব দেন ১৯৭৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে। আমি তাঁকে বলি যে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি নিজের পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তাছাড়া মিলিটারি প্রশাসন সম্পর্কে আমার গভীর অনীহা আছে। তিনি বলেন, এখন তো আর মিলিটারি ব্যবস্থা নয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক কিছুর উত্থান-পতন ঘটে গেছে। এখন অনেকটা শান্ত, পুনর্গঠনের কাজ চলছে। তাছাড়া আমিও বিশ্বাস করি সামরিক শাসন বেশিদিন চলতে পারে না। এটা সমস্যার সমাধান নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রে দ্রুত দেশকে নিয়ে যেতে হবে। আপনাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে দেশের জন্য কল্যাণ হবে। এর কয়েক দিন পর জেনারেল জিয়ার একান্ত সচিব (মিলিটারি) আমাকে টেলিফোন করেন। বলেন, জেনারেল জিয়ার সঙ্গে চায়ের আমন্ত্রণ। ওই দিন তিনি আমাকে বলেন, আপনাকে অনেক দিন থেকে বলছি আপনি আসছেন না। আপনার আর দেরি করা ঠিক নয়। উপদেষ্টা পরিষদে অনেকেই আছেন। তারা কাজ করছেন। তাদের ধ্যান-ধারণা অনেকটা পুরনো। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে নতুন ধ্যান-ধারণায়।
আমি তাকে জানাই যে, দেশের বাইরে লন্ডনে যাচ্ছি। ফিরে আসার পর আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবো। লন্ডন থেকে ফিরে এলে তিনি আবার ফোন করেন। বললেন, আপনাকে আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে চাই। আমি বললাম আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মত আছি, তবে বেশি দিন এই দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। জিয়া বললেন, বেশি দিন থাকতে হবে না। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই নির্বাচন দেয়া হবে। তবে আমার স্ত্রী আমার সিদ্ধান্তে রাজি ছিলেন না। আমার শ্বশুর চট্টগ্রামে ছিলেন। তাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। তার পরামর্শ চাই। তিনি বললেন, দেখ বাবা, রাজনীতি করতে আমি তোমাকে বলি না, দেশটা স্বাধীন হয়েছে, এইজন্য অনেক লোক কষ্ট করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। এই অবস্থায় উপদেষ্টা পরিষদে যাওয়া বিবেচনার বিষয়। এর সঙ্গে কিছুটা ঝুঁকি অবশ্যই আছে। তবে ঝুঁকি এড়িয়ে জীবনে বড় হওয়া যায় না। আর এ সময় জাতি নেতৃত্বহীনভাবে ভাসমান অবস্থায় আছে। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের মাঝে জাহাজের একজন নাবিক কতটুকুই-বা কাজ করতে পারেন। তোমাদের মতো কিছু লোক যদি তাকে সাহায্য করে, তাহলে দেশের উপকার হবে। জিয়াউর রহমানও বলতেন, আপনারা কাজ করছেন দেশের জন্য, আমার জন্য নয়। এ সময় আপনাদের দেশের জন্য কাজ করতে হবে। এটা শুধু আমার একার দায়িত্ব নয়, আপনাদেরও দায়িত্ব। ফলে ওই উপদেষ্টা পরিষদে আমি যোগদানের সিদ্ধান্ত নিই। প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটা বিষয় আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি সত্ মানুষকে গুরুত্ব দিতেন এবং উপদেষ্টা পরিষদেও সেধরনের লোকের সমাবেশ ঘটান।
জিয়ার গণভোট সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে এম সাইফুর রহমান লেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া একদিন বললেন, উপদেষ্টা পরিষদ দিয়ে কতোদিন দেশ চালানো যায়? রাজনৈতিক শূন্যতা দেশের জন্য ভালো নয়। তাছাড়া সেনাবাহিনীর চিফ ও প্রেসিডেন্ট এক ব্যক্তি—এ নিয়ে কথা উঠছিল। জিয়ার ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের মত আছে কিনা, তা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। তখন উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত (এরপর ১০-এর পৃষ্ঠায়)
নেয়া হয় প্রেসিডেন্টের উচিত গণভোটে যাওয়া। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াকে চায় কিনা। সেকারণে ‘হ্যাঁ না’ ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। জিয়া প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক আইন প্রশাসক ও বেসরকারি উপদেসষ্টা পরিষদের সমন্বয় সাধন করা প্রেসিডেন্টের পক্ষে কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়। যাই হোক, ১৯৭৭ সালের ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
এই রেফারেন্ডাম বা গণভোটের জন্য প্রচারকাজে বিভিন্ন এলাকায় জনসভা করার প্রয়োজন ছিল। ড. এমএন হুদা বললেন, তিনি যেতে পারবেন না। হাফিজ উদ্দিন এবং আরো কয়েকজন উপদেষ্টা বললেন, গণভোটের প্রচার অভিযান তারা করতে পারবেন না। এ সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে গণভোটের ক্যাম্পেইন করার কাজ করতে বলেন। গণভোটের পক্ষে পাবলিসিটি—এটাই ছিল আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এর আগে আমি কখনো জনসভা বা পাবলিক মিটিংয়ে যাইনি। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কাজে বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের সময় কাজ করেছিলাম। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ জিয়াউর রহমানের গণভোটের মাধ্যমে। আমি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রচার চালাই। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, দেশে দ্রুত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করলেন। অরাজনৈতিক উপদেষ্টাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক লোকদেরও উপদেষ্টা করলেন, জাগদল গঠিত হলো। দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলো। এরপর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করে সব দলের উপস্থিতিতে সংসদ নির্বাচন হলো। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করলেন জিয়া। প্রফেসর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তিত্ব যোগ দিলেন। প্রতিটি প্রক্রিয়ার সঙ্গেই ছিলাম আমি। জিয়াউর রহমান আমাকে বিশ্বাস করতেন এবং আমার প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আস্থা। আমিও তাঁকে সবসময় সত্পরামর্শ দিয়েছি এবং সবধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।
সাইফুর রহমান লেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটা গুণ ছিল, তিনি যদি কাউকে কোনো কাজে পাঠাতেন বা তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে যারা যেতেন তারা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করতেন, তাহলে তিনি তার প্রশংসা করতেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়ার জন্য নির্ধারিত অস্থায়ী সদস্যপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নতুন দেশ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করানো। সে সময় জাপান আমাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়। জাপানের মতো একটা শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো কিনা, তা নিয়ে প্রথমেই আমাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তাছাড়া আমাদের বড় ডোনার কান্ট্রিও ছিল জাপান। উপদেষ্টা কাউন্সিলে এ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় সবাই বললেন, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। একটিমাত্র অস্থায়ী সদস্যপদ। প্রতি দু’বছর পর পর জাপান প্রার্থী দেয়, এটা ফেয়ার নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, ভারত আমাদের সমর্থন করলে আমরা জয়ী হতে পারবো। তিনি বললেন ইন্ডিয়ার সঙ্গে সাইফুর রহমানের সম্পর্ক ভালো। উনি ইন্ডিয়াকে বোঝাতে পারবেন। ফলে আমি প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হয়ে ভারতে গেলাম। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হলো। তিনি তার পররাষ্ট্র সচিবের আপত্তি সত্ত্বেও তত্ক্ষণাত্ বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানান। একইসঙ্গে আমাকে পাঠানো হলো শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে। তিনটি দেশ সফর করে তাদের সমর্থন আদায় করলাম। তারা আমাদের সমর্থন জানায় এবং বাংলাদেশ ওই সম্মানিত পদে নির্বাচিত হয়। এজন্য প্রেসিডেন্ট জিয়া খুব খুশি হন। ওই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুহাম্মদ শামস উল হক। তিনি আমাকে একটা পত্র দেন। ওই পত্রে তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন যে, আপনার কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে জাপান সফরের এক স্মৃতির কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, অধ্যাপক শামস উল হক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে প্রকৃতপক্ষে আমিই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ করতাম। আমাকে বার বার ইন্ডিয়া যেতে হয়েছে, প্রেসিডেন্ট আমাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গেছেন। ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিশনেও আমাকে যেতে হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ওহিরা’র মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আমাকেই ফিউনারেলে পাঠানো হবে। এতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দেবেন। আমরা প্রতিনিধি দলে ছিলাম ৩ জন। আমি, পররাষ্ট্র সচিব এসএমএসএ কিবরিয়া ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি এমআর ওসমানী। সময়টা ছিল ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের বাইরে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ সামনেই সাধারণ নির্বাচন ছিল। জাপান যাওয়ার একদিন আগে জিয়া আমাকে টেলিফোন করলেন রাত ৮টার দিকে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও খুব কাছাকাছি ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া মনে করেছিলেন, নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রেসিডেন্ট কার্টার আসতে পারবেন না। কিন্তু পরেই জানা গেল প্রেসিডেন্ট কার্টার একদিনের জন্য জাপান যাবেন এবং ফিউনারেলে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের স্বার্থেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাত্ করা জরুরি। তাছাড়া এর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট কার্টারের সাক্ষাত্ হয়নি। ফিউনারেলে যোগদানে এই সুযোগটি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু প্রতিনিধি দলের নাম আগেই চলে গেছে। এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাকে টেলিফোন করে বলেন, ‘মিস্টার ফাইন্যান্স মিনিস্টার, উড ইউ টেক মি এজ ইউর কমপেনিয়ন ইন জাপান।’ উনি আরো বললেন, আপনারা ফাইন্যান্স মিনিস্টাররা অত্যন্ত লাকি। দু’দিন পর পর বিদেশ চলে যান। ওয়াশিংটন, জেনেভা, লন্ডন, টোকিও। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার সুযোগ তো কম। কোনো প্রেসিডেন্ট দাওয়াত না করলে এবং প্রকৃত উপযোগী সফর না হলে তো যাওয়া যায় না। আমি তখন রসিকতা করে বলি, ফাইন্যান্স মিনিস্টার হওয়ার জন্য আপনি যু্দ্ধ করেছেন? তাহলে প্রেসিডেন্সি চলবে কী করে? যা হোক, আপনি কি যেতে চান? উনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তো যেতে চাই। প্রতিনিধি দলের নাম তো তাদের কাছে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আই উড লাইক টু মাই সেলফ এজ এ মেম্বার অব দ্য ডেলিগেশন। আমি বললাম, ডেলিগেশনে আপনার নাম শুধু যোগ হবে না, ইউ উইল বি লিডিং দ্য ডেলিগেশন। এভাবেই তিনি জাপান গেলেন। তিনি আমার সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন। আমরা ওনার সঙ্গী হলাম। দেখেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া কত সুন্দরভাবে কথাগুলো বলেন। কারণ তিনি জানতেন দলের নাম আগেই জাপান পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রটোকলের বিষয় ছিল। এসব কারণে তিনি ওইভাবে কথা বলেননি। যা হোক, আমরা জাপান গেলাম। প্রেসিডেন্ট কার্টারের সঙ্গে জিয়ার সাক্ষাত্ হলো। আমি জাপানের কাছ থেকে ৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণেরও ব্যবস্থা করলাম। আমার কথা শুনে প্রেসিডেন্ট জিয়া চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে ওআইসিতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ওআইসির মতো একটা আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখা ভালো।
চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে সাইফুর রহমান লেখেন, ১৯৮১ সালের বাজেট প্রস্তুতির কাজ করছিলাম। ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জিয়া ভোর বেলা আমাকে টেলিফোন করে বলেন, আমি চট্টগ্রাম যাচ্ছি। আপনার কাছে দু’টো ফাইল যাচ্ছে। তাতে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে। ফাইল দু’টো সই করে দেবেন। আমি প্রেসিডেন্টকে বললাম, বাজেট পেশ করার মাত্র ৬ দিন বাকি। এ সময় তো আপনার আমার সঙ্গে থাকার কথা। উনি বললেন আমি কালই চলে আসবো। এরপর আপনাকে সময় দেবো। তখন ব্যাংকে অরাজকতা চলছিল। আমি বললাম, এ ব্যাপারে আপনি যদি চট্টগ্রামের জনসভায় একটা কঠোর সতর্কবাণী দেন তাহলে ভালো হবে। এতে তারা সংযত হবে। প্রেসিডেন্ট জিয়া মন্তব্য করেন, আমাকেই সবকিছু করতে হবে কেন? তাহলে আপনারা আছেন কেন? কেন, সাত্তার সাহেব করতে পারেন না? উনি ভাইস প্রেসিডেন্ট না? প্রেসিডেন্ট জিয়া একনাগাড়ে কথাগুলো বললেন। তিনি সাধারণত এভাবে বলেন না। এটাই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।
৩০ মে ভোর বেলায় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। রাতেই প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয় আমি জানি না। আমি বাসায় ছিলাম। কারণ কথা ছিল প্রেসিডেন্ট ঢাকায় ফিরলে আমি বঙ্গভবনে যাবো এবং বাজেট নিয়ে আলোচনা করবো। ভোর বেলা বঙ্গভবন থেকে একটা টেলিফোন পাই, আমাকে সেখানে জরুরিভাবে যেতে বলা হলো। ফোন করেছেন সামরিক সচিব। আমি ভেবেছি হয়ত প্রেসিডেন্ট এসে গেছেন, আমাকে ডেকেছেন। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হয়েছেন। বঙ্গভবনে গিয়ে প্রেসিডেন্টের কামরায় ঢুকলাম। দেখলাম প্রেসিডেন্টের চেয়ারে জাস্টিস সাত্তার সাহেব বসে আছেন। এ অবস্থা দেখে আই গট এ শক। জামাল উদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার? জামাল উদ্দিন আমাকে বলেন, জানেন না? প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। আমি চমকে গেলাম। জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন বলে বঙ্গভবনে ধারণা পেলাম। জামালউদ্দিন বললো, এমনভাবে প্রেসিডেন্টের দিকে গুলি ছোঁড়া হয় যে, তাঁর দেহের অনেক অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাঁর লাশ চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। মঞ্জুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি এরকম একটি কাজ করবেন বলে আমার মনে হয় না। বেঁচে থাকার সময় দেখেছি জিয়ার সামনেই মঞ্জুর উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। তবু মঞ্জুর ছিলেন জিয়ার ভালো বন্ধু। জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। জিয়া সাহেবের পত্রের জবাব তিনি দিতেন উদ্ধতভাবে। আমরা এসব জানার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলি, আপনি চট্টগ্রামে যাবেন না। মঞ্জুর যদি কোন অঘটন ঘটায়। উনি হাসতেন। বলতেন, মঞ্জুর বুদ্ধিমান। বোকার মতো সে চট্টগ্রাম থেকে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে না। বস্তুত মঞ্জুর ছিলেন জিয়ার ভাল বন্ধু। প্রেসিডেন্ট জিয়ারও দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, মঞ্জুর তার কোনো ক্ষতি করবেন না। জিয়া নিহত হওয়ার পরদিন আমি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। তিনি খুবই শোকাহত ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, এতবড় একটি ঘটনা ঘটে গেল, একজন প্রেসিডেন্টকে মেরে ফেলা হলো, আর সবাই যে যার যার মতো সেখান থেকে পালিয়ে গেল, সৈন্যরাও কারো কোনো ক্ষতি করলো না, শুধু একজনকে পৃথকভাবে মারলো—এটা কী করে সম্ভব? উনি বার বার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ডাক্তার সাহেব কোথায় (অর্থাত্ অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী)? তখন বি চৌধুরীও জিয়ার সঙ্গে চট্টগ্রামে ছিলেন। আমি বললাম, ওনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। বেগম জিয়া তার মুখ থেকে হয়তো ওই সময়ের অবস্থা জানতে চাচ্ছিলেন। বেগম জিয়াও বিশ্বাস করতেন না যে, মঞ্জুর তার স্বামীকে হত্যা করেছে। কারণ জিয়া ও মঞ্জুর এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, একথা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, জিয়ার কোনো ক্ষতি করবে মঞ্জুর বা মেরে ফেলবে। মঞ্জুর জিয়াকে মেরেছে, একথা এখনো বেগম জিয়া বিশ্বাস করেন বলে আমার মনে হয় না। এটা এখনো অমীমাংসিত রহস্য রয়ে গেছে যে, জিয়াকে কে বা কারা মেরেছে। জেনারেল এরশাদ তাড়াহুড়া করে তদন্ত শেষে কয়েকজন লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিল।
জিয়ার মৃত্যুর পর আমি সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। বর্তমান সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ ইবনে আজিজ তখন ছিলেন ন্যাশনাল গার্ড-এর প্রধান। তিনি আমাকে চিনতেন। সৌদি সরকারের সবাই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সম্মান করতেন। তিনি আমাকে বললেন—তোমাদের লোকেরা কীভাবে জিয়াকে নিহত করতে পারলো? তিনি এমন একজন উদীয়মান তারকা যিনি মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিলেন। আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন